ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বিএনপি


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য


ভূমিকা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তন, সংকট ও পুনর্গঠন ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার মাত্র সাত বছর পর, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ দলটি দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।


প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপট

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়। একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) ভেঙে পড়ে এবং সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন ধারা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।


আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন

বিএনপির মূল দর্শন হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  1. স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
  2. ইসলামি মূল্যবোধ, জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা।
  3. বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা।
  4. গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গঠন।
  5. বহুমুখী ও বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতি।

প্রাথমিক সাফল্য ও রাজনৈতিক উত্থান (১৯৭৮–১৯৮১)

  • ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রার্থী হয়ে ব্যাপক সমর্থন পান।
  • ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
  • এ সময় গ্রামীণ উন্নয়ন, মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনীতি, এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আসে।

নেতৃত্ব সংকট ও পুনর্গঠন (১৯৮১–১৯৯০)

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বিএনপি বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। এরপর বেগম খালেদা জিয়া দলীয় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তিনি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন এবং এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

  • ১৯৮২–১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিএনপি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
  • ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়ে সামরিক শাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গণতন্ত্রের পথে প্রত্যাবর্তন (১৯৯১)

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

  • দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসা হয়।
  • অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ খাত সংস্কার, এবং প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পালাবদলের রাজনীতি (১৯৯১–২০০৬)

  • ১৯৯১–১৯৯৬: বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কার করে, তবে রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি পায়।
  • ২০০১–২০০৬: বিএনপি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত উন্মুক্তকরণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
  • তবে এ সময় দুর্নীতি, দলীয়করণ ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগও উত্থাপিত হয়।

ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার

১. গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত: সামরিক শাসন ও একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।
২. বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: স্বাধীনতার পর জাতীয় পরিচয়ের ভিন্ন মাত্রা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বিএনপির অন্যতম ঐতিহ্য।
৩. নারী নেতৃত্ব: বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের নজির সৃষ্টি করেছে।
৪. বহুমুখী কূটনীতি: বিএনপি বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে।



উপসংহার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছে এ দলটি। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েও বিএনপি এখনো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে বিএনপির ইতিহাস ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে।